Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন
Main Comtent Skiped

জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

 

ঠাকুরগাঁও জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

 

ক্রঃ নং

পুর্ণ নাম

জন্ম স্থান

জন্ম ও মৃত্যুর সন

কোন বিষয়ে বিখ্যাত

০১

সুবেদার আহমেদ হোসেন

পটিয়া, চট্টগ্রাম

১৯২৬ জন্ম

২০০৯ মৃত্যু

মুক্তিযুদ্ধ

০২

মুহম্মদ দবিরুল ইসলাম

 

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাধীন বামুনিয়া গ্রামে জন্ম লাভ করেন

১৯২২ জন্ম

১৯৬১ মৃত্যু

রাজনৈতিক

০৩

মির্জা রুহুল আমিন

 

আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে

১৯২১ জন্ম

১৯৯৭ মৃত্যু

রাজনৈতিক

০৪

মোঃ রেজওয়ানুল হক (ইদু) চৌধুরী

ঠাকুরগাঁও উপজেলার ছোট বালিয়া নামক গ্রামে

-

রাজনৈতিক

০৫

আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী

 

 

১৯০২ জন্ম

১৯৮৭ মৃত্যু

রাজনৈতিক

০৬

আবু মোজাফ্ফর ইবনে জাহিদ মোহাম্মদ ইউসুফ

রাণীশংকৈল উপজেলার বনগাঁও গ্রামে

১৯৭৭ মৃত্যু

রাজনৈতিক

০৭

হাজী কমরুল হুদা চৌধুরী

 

সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামে

১৯০৮ জন্ম

১৯৯১ মৃত্যু

সমাজ সেবক

০৮

খোরশেদ আলী আহমদ

 

পীরগঞ্জ উপজেলার ভোমরাদহ গ্রামে

১৯০৬ জন্ম

২০০১ মৃত্যু

সমাজ সেবক

০৯

আব্দুর রশিদ মিঞা

 

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পারুয়া গ্রামে

১৯২৮ জন্ম

২০০৫ মৃত্যু

রাজনৈতিক

১০

মো: ফজলুল করিম

 

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কানিকশালগাঁও গ্রামে

১৯২৭ জন্ম

রাজনৈতিক

১১

সৈয়দা জাহানারা

 

 

 

সমাজ সেবক

১২

ইঞ্জিনিয়ার ইজাব উদ্দিন আহমেদ

 

 

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিষমারী গ্রামে

১৯১৯ জন্ম

সমাজ সেবক

১৩

মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ

 

ঠাকুরগাঁও উপজেলার সৈয়দপুর দানারহাট গ্রামে

১৯৮৪ মৃত্যু

রাজনৈতিক

 

সুবেদার আহমদ হোসেন বীর প্রতীক

সুবেদার আহমদ হোসেন বীর প্রতীক ঠাকুরগাঁওয়ের অহংকার। সুবেদার আহমদ হোসেন ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার কুসুমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ সিপাহী হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ঠাকুরগাঁওয়ে নায়েব সুবেদার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সহকর্মীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্ম সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপরাপর সহযোদ্ধাসহ ২৮ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঠাকুরগাঁও ইপিআর ক্যাম্পে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বেরিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস ৬ নং সেক্টরের অধীনে ৬ নং সাব সেক্টরে বিভিন্ন রণক্ষেত্রে ৯ ডি কোম্পানী কমান্ডার হিসাবে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে পাক হানাদার বাহিনীকে পযদুস্ত করার অসামান্য বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। নুনিয়াপাড়ায় পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে বোমার আঘাতে তিনি আহত হন। যার ধারাবাহিকতায় তিনি বীর প্রতীক খেতাব অর্জন করেন।  

সুবেদার আহমদ হোসেন বীর প্রতীক আমাদের গৌরব। আমাদের অহংকার। তাঁর বীরত্ব আমাদের অনুপ্রেরণা।

মুহম্মদ দবিরুল ইসলাম

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার  সূচনা পর্বে  ‘‘ রাষ্টভাষা বাংলা চাই’’ আন্দোলন, ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে কর্মচারীদের আন্দোলন, পূর্ব পকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ  (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) গঠন, যে কজন তেজোদীপ্ত তরুণ ছাত্রনেতা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে মুহাম্মদ দবিরুল ইসলাম অন্যতম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ক্লাসের সহপাঠী। মুহম্মদ দবিরুল ইসলাম ২৯ ফাল্গুন ১৩২৮ সালে (বাংলা), ১৩ মার্চ ১৯২২ সালে ঠাকরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাধীন বামুনিয়া গ্রামে জন্ম লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলানা তমিজউদ্দিন আহমেদ, মাতা দখতর খানম। মাতামহের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের প্রখ্যাত জামালপুর জমিদার বাড়ি। তিনি লাহিড়ী এম ই স্কুল থেকে বিভাগীয় বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। ঠাকরগাঁও হাই স্কুল হতে ১৯৩৮ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন । সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়ন কালে রাজশাহী বিভাগীয় ‘‘মায়াদেবী উন্মুক্ত রচনা প্রতিযোগিতায়’’স্বর্ণপদক লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে আই.এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের স্বাধীকার আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী ও অন্যান্য আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে এবং সরকারী রোষানলে পড়েন। পরে ১৯৪৭ সালে তিনি বি.এ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন। বিভিন্ন আন্দোলনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং ১৯৫৫ সালে কারাবাস থেকে এল.এল বি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্তের সাথে উর্ত্তীর্ণ হন।

১৯৪৭ সালের ৬/৭ সেপ্টেম্বরের ঢাকায় গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মী সম্মেলনে দিনাজপুর থেকে ছাত্রনেতা দবিরুল ইসলামের নেতৃত্বে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল ও আব্দুর রহমান যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে নঈমুদ্দিন আহমদকে আহবায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলীগ ছাত্রলীগের প্রথম সাংগঠনিক কমিটি  গঠিত হয়। এই কমিটিতে দিনাজপুর জেলা থেকে দবিরুল ইসলাম, ফরিদপুর জেলা থেকে শেখ মুজিবর রহমান, কুমিল্লা থেকে অলি আহাদ সহ বিভিন্ন জেলার তেরজন সদস্য হিসেবে অন্তভূুর্ক্ত হন। ছাত্র মহলে পূর্ব পকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্ধুদ্ধ করে। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে দিনাজপুরের নূরুল হুদা, কাদের বক্স, মুসাতফা নূরউল ইসলাম, এম আর আক্তার মুকুল, দবিরুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃত্ব দেন।

১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে দবিরুল ইসলাম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দবিরুল ইসলাম যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভায় তিনি প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ( শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম) নিযুক্ত হন সে সময়ে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে সুগার মিল স্থাপনের জন্য জোরালো উদ্যোগ গ্রহন করেন।  বিরল প্রতিভার অধিকারী মুহাম্মদ দবিরুল ইসলাম ১৯৪৯ ও ১৯৫৪ সালে কারা অভ্যন্তরে অকথ্য নির্যাতন ভোগ করায় হৃদ রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন। ফলে অকালে ১৯৬১ সালে তিনি অকালে ইন্তিকাল করেন।

 

মির্জা রুহুল আমিন

মির্জা রুহুল আমিন পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে সম্ভ্রামত্ম মির্জা পরিবারে ১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রম্নয়ারী  জন্ম গ্রহণ করেন। মির্জা রুহুল আমিন এ এলাকায় চোখা মিয়া নামেই বেশি পরিচিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরুকরে মৃত্যুর পূর্ব পর্যমত্ম এই মানুষটি ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার মানুষের কাছে সমাজ পরিবর্তনের একজন সুমহান নেতা। তিনি ছিলেন একাধারে শিÿক, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং  ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বি.এ পাশ করেন।

মির্জা রুহুল আমিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-- আবির্ভাব ঘটেছিল পাক-ভারত স্বাধীনতার ঊষালগ্নে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি পীরগঞ্জ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ঠাকুরগাঁও হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি কিছু দিন পর  চাকুরী ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর ঠাকুগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা রুহুল আমিন ১৯৬২-১৯৬৬ সালে পরপর দু’বার পূর্ব পকিস্তানের প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৯ ও ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে দুইবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী এবং মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ঠাকুরগাঁও সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও সরকারী মহিলা কলেজ, ঠাকুরগাঁও সরকারী কলেজ, সি.এম আইয়ুব বালিকা বিদ্যালয় ও হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মির্জা রুহুল আমিন তাঁর সমগ্র জীবন মানু, সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করে হয়েছেন স্মরণীয় ও বরণীয়। এই মহান কৃতি সমত্মান ১৯৯৭ সালের ১৯ জানুয়ারী ইন্তেকাল করেন।

 

মোঃ রেজওয়ানুল হক (ইদু) চৌধুরী

ঠাকুরগাঁও উপজেলার ছোট বালিয়া নামক গ্রামে চৌধুরী পরিবারে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম রমজান আলী চৌধুরী এবং মাতার নাম ফজিলাতুন্নেসা। বর্ণাঢ্য কৃষক পরিবারে জন্মের কারণে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী তারুন্যের দিনগুলোতে বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর পোশাক ছিল সাহেবী কায়দার। কোর্ট, প্যান্ট, সার্ট পরা গাড়ী চালানো ছিল তাঁর নেশা। কিন্তু মাওলানা ভাসানীর সান্নিধ্যে আসার পর ইদু চৌধুরীর জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। মাওলানা ভাসানীর অনুসারী হওয়ার পর সাথে সাথে সাহেবী পোশাক ছেড়ে দিয়ে তিনি আজীবন আবহমান বাংলার খদ্দরের বাংলার পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি পরিধান করেন। সাধারণ সহজ সরল দিন যাপন শুরু হয়। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হওয়ার পরে মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে নিয়মমাফিক পোশাকে তাঁকে উপস্থিত করানো যায়নি। অবশেষে শুধু তাঁর জন্যেই নিময় শিথিল করে তাঁকে পায়জামা পাঞ্জাবী ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি পায়জামা পাঞ্জাবী পরেই শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

১৯৫৭ সালে ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন। রেওয়ানুল হক চৌধুরী তিনি ন্যাপ দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি এবং দিনাজপুর জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর ঐহিহাসিক ফারাক্কা বাঁাধের লং মার্চে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কৃষক ঋণ, সুদ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা ইত্যাদি বিষয়ে কৃষকের দুর্দিনে তিনি কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

জনসেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী। তাঁকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার রূপকার বলা হয়। রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয় এবং সি.এম আইয়ুব বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত করেছেন উমেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, সবদল ডাঙ্গা কল্যান ট্রাস্ট, সোনাপাতিলা জামে মসজিদ, ফজিলাতুল্লেসা শিশু পরিবার। ১৯৬১ সালে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী তেভাগা আন্দোলনের বিখ্যাত কৃষকনেতা হাজী মোঃ দানেশ এর কন্যা সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী

ঠাকুরগাঁও জেলার বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজীতিবিদ, সমাজ হিতৈষী জনদরদী ব্যক্তি ছিলেন আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী। ১৯০২ সালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেকমতুল্লা চৌধুরী। উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ছিলেন আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী। দেবীগঞ্জ হাইস্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আই.এ পাস করার পর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ডিস্টিংশনে বি.এ পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ল’ পাস করার পরে কলকাতাতেই কিছুদিন আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপরে ঠাকুরগাঁওয়ে এসে আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। ঠাকুরগাঁও আইন পেশায় পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির সময় ঠাকুগাঁও মহকুমার পঞ্চগড়, বোদা, তেঁতুলিয়া, দেবীগঞ্জ ও আটোয়ারী থানা যাদের নেতৃত্বে পাকিস্তান অংশে আসে, আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তিনি ঠাকুরগাঁও মহকুমার মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬২ সালে আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী ঠাকুরগাঁও মহকুমা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী জাতীয় পরিষদের দ্বিতীয়বারের জন্য এম.এন.এ নির্বাচিত হন। প্রথমবারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এবং পরবর্তী নির্বাচনের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পার্লামেন্টারী সেক্রেচারী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী থাকা অবস্থায় ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়নে অনেকগ্রলো পোষ্ট স্থাপন করেন। একই সময়ে এলাকায় প্রচুর রাস্তা তৈরি করেছিলেন। ঠাকুরগাঁও সুগার মিল ও ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া সড়ক নির্মাণে অবদান রেখেছিলেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় এক সময় চালু হয়েছিল ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর।

আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী দিনাজপুর জেলা পরিষদের সহ সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে পাঁচ বছর ধরে কাজ করেছেন। এ সময়ে তিনি ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় এলাকায় প্রচুর দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। ঠাকুরগাঁও সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। কাচারী জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে তাঁর অবদান রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আলহাজ নূরুল হক চৌধুরী খুব সহজ সরল সাধারণ জীবন যাপন করতেন। সদালাপী ও বন্ধুভাবাপন্ন এই মানুষটি ১৯৮৭ সালে ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

 

আবু মোজাফ্ফর ইবনে জাহিদ মোহাম্মদ ইউসুফ

জন্ম রাণীশংকৈল উপজেলার বনগাঁও গ্রামে। বিশিষ্ট সমাজ সেবী দানশীল ব্যক্তিটি সবার কাছে মোজাফ্ফর উকিল নামে পরিচিত। পাকিসত্মান আমলে মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছেন দীর্ঘদিন। তৎকালীন দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন। এ অপরাধে ৭১-এ পাক সেনারা তাঁকে গ্রেফতার করে এবং অমানবিক নির্যাতন করে। পাকিসত্মানী সেনারা রাজশাহী ছেড়ে চলে গেলে তিনি নাটোর কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরবর্তীতে তিনি ভাসানী ন্যাপ ও বাংলাদেশ পিপলস্ পার্টির রাজনীতি করেন। নেকমরদ আলিমুদ্দীন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় এবং বনগাঁও আবু জাহিদ হাই স্কুল তাঁর স্মৃতির স্বাক্ষর বহন করছে। তিনি ১৯৭৭ সালের ২২ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

 

হাজী কমরুল হুদা চৌধুরী

হাজী মো: কমরুল হুদা চৌধুরী ছিলেন সমাজ সেবক, বিদ্যানুরাগী ও রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯০৮ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের এক সম্ভ্রামত্ম মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।

আলোকি সালন্দরের রূপকার কমরুল হুদা চৌধুরী ‘‘সালন্দর বিদ্যাপীঠ’’ এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রাথমিক বিদ্যালয়, সালন্দর উচ্চ বিদ্যালয় এবং সালন্দর ডিগ্রী কলেজের অবস্থান এই বিদ্যাপীঠে। সালন্দর বিশ্ব ইসলামী মিশন, ডাকঘর ও ইক্ষুকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া তিনি ঠাকুরগাঁও চিনিকল পরিচালনা বোর্ডের সদস্য, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য এবং জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘদিন সালন্দর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। এই বিশিষ্ট সমাজ কর্মী ১৯৯১ সালের ৩০ নভেম্বর ইমেত্মকাল করেন।

 

খোরশেদ আলী আহমদ

খোরশেদ আলী আহমদ ঠাকুরগাঁও জেলার একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সেবক এবং শিক্ষা বিসত্মারে একজন অগ্রপথিক ছিলেন। তিনি পীরগঞ্জ উপজেলার ভোমরাদহ গ্রামে ১৯০৬ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রিয়াজ উদ্দিন আহমদ ও মাতার নাম আমেনা খাতুন।

তিনি ছিলেন অত্যমত্ম মেধাবী ছাত্র। ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল থেকে তিনি গণিত ও ফারসিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অত:পর রাজশাহী কলেজ থেকে স্বর্ণ পদক নিয়ে আই এস সি পাস করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবী সাহিত্যে অনার্স ও এল এল বি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি বৃটিশ বিরোধী বিরোধী আন্দোলন, দেশের স্বাধিকারের জন্য মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত জড়িয়ে পড়েন। তিনি দিনাজপুর জিলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল ও হরিপুর এলাকা হতে এম.এল.এ পদের জন্য নির্বাচন করেন। শুরুতে তিনি আইন ব্যবসায় নিয়োজিত হলেও এই অবহেলিত অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার মহৎ প্রয়াসে আইন পেশা ছেড়ে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার রহিম বকস্ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। দেশ বিভাগের পর পীরগঞ্জ হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

খোরশেদ আলী আহমদ শুধু শিক্ষকতা নিয়েই ব্যসত্ম থাকেন নি। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবার প্রয়াসে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠ করেন ভোমরাদহ ইসলামিয়া হাই স্কুল। উচ্চ শিক্ষার পথ প্রসসত্ম করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন পীরগঞ্জ কলেজ। এছাড়া তিনি পীরগঞ্জ বণিক বালিকা বিদ্যালয় ও পীরডাঙ্গী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও বিদ্যানুরাগী ২০০১ সালের ১ মে দিনাজপুর শহরে ইমেত্মকাল করেন।

 

আব্দুর রশিদ মিঞা

বিশিষ্ট আইনজীবি, রাজনীতিবিদ সমাজ সেবক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঠাকুরগাঁও শহরে যিনি সুপরিচিত তিনি মরহুম আব্দুর রশীদ মোক্তার। মো: আব্দুর রশিদ বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পারুয়া গ্রামে ১৯২৮ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আইন ব্যবসার সাথে সাথে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ঠাকুরগাঁও আওয়ামী লীগের প্রথম সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি বিপস্নবী কমিটির সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তিনি মরাগোচী ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। একজন সফল মুক্তিযোদ্ধার সংগঠন হিসেবে সে সময় তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঠাকুরগাঁও সাধারণ পাঠাগারম শিল্পকলা পরিষদ ও ঠাকুরগাঁও নাট্যসমিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘদিন রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অংগনের সাথি জড়িত এই নির্লোভ মানুষটি ১০ জুলাই ২০০৫ সালে ইমেত্মকাল করেন।

 

মো: ফজলুল করিম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনের কেন্দ্র বিন্দু ছিলেন মো: ফজলুল করিম। তিনি ১৯২৭ সালের ২৭ মকার্চ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কানিকশালগাঁও গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নইমউদ্দীন আহাম্মদ এবং মাতার নাম সতিজান নেসা। তিনি ১৯৪৬ সালে ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এখানেই তাঁর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে পরিচয় হয় এবং ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৫০ সালে বি.এ পাস করে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়ালেখা শেষ না করে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আসেন এবং সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৫ সারে মোক্তারী পাস করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঠাকুরগাঁওয়ে তিনি গ্রেফতার হন। তিনি ১৯৬২ সালের হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দগফা আন্দোলন ঠাকুরগাঁওয়ে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নমিনেশন নিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৬ নং সেক্টরের সিভিল এ্যাডভাইজার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি জেলা গভর্ণর হন। তিনি সমাজ সেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ঠাকুরগাঁও সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রিভার ভিউ হাই স্কুল ও ঠাকুরগাঁও সরকারী মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিশাল অবদান রয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। জনাব ফজলুল করিম সদালাপী সুমার্জিত ব্যবহারের অধিকারী। তাঁর সততা সর্বজন বিদিত। তাই তিনি সকল মানুষের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।

 

সৈয়দা জাহানারা

ঠাকুরগাঁও জেলার অগ্রণী মহিলাদের পথিকৃত হলেন সৈয়দা জাহানারা। নারীদেরকে শিক্ষা সংস্কৃতির আলোর জগতে নিয়ে আসনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ঠাকুরগাঁও জেলার অনেকগুলো সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে অগ্রণী মহিলা সংসদ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সমিতি গঠন করে ঠাকুরগাঁওয়ে সামাজিক কর্মকা-- তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ক্ষতিগ্রস্থ নারী ও শিশুদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি আরডিআরএস এ মহিলা বিভাগে যোগ দেন। তিনি মুন্সিরহাট মহিলা বহুমুখী সমবায় সমিতি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন এবং মহিলাদের তৈরী কুটির শিল্প বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করেন।

এক সময় ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং পরে মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও সাহায্য সংস্থা ইউএসসি-কানাডা বাংলাদেশ এর পরিচালক ছিলেন। ঠাকুরগাঁওয়ে সাহিত্য সাংস্কৃতিক অংগনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তাঁকে ঠাকুরগাঁওয়ের নারী জাগরণের ক্ষেত্রে ‘বেগম রোকেয়া’ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

 

ইঞ্জিনিয়ার ইজাবউদ্দিন আহমেদ

১৯১৯ সালের ২২ মে, বাংলা ১৩২৬ সালের ৮ জ্যৈষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার ইজাবউদ্দিন আহমেদ বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিষমারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালে চড়তা মিডল ইংলিশ স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৩৫ সালে ঠাকুরগাঁও হাইস্কুলে এবং পরে কলকাতা পার্ক সার্কাস স্কুলে ভর্তি হন। পার্ক সার্কাস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করেন। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে পাস করেন। অসম্ভব মেধাবী ছিলেন তিনি। প্রখর স্মরণশক্তি ছিল তাঁর। প্রতিটি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছেন। কলকাতার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে তাঁর রচিত ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে বলেছেন-‘কলকাতা যাওয়ার সুযোগ না হলে আর যাই হোক আমার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সুযোগ হতো না। জীবনেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারতাম না। তৎকালে কলকাতাই ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রুচি গড়ে উঠবার প্রাণকেন্দ্র।

আই.এস.সি পরীক্ষার পর হাইস্কুলে মাস্টারি করেছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের পর ‘অল ইন্ডিয়া পেটেন্ট এন্ড ডিজাইনস’ অফিসে চাকরি করেন। পরবর্তীতে রেলওয়ে বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মধ্য প্রদেশের রায়পুর এবং ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর, কোয়েটা ও ইরানের মিরজাওয়ায় চাকরি করেন। ১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসেন। তখন তাঁর দুচোখে ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন। দেশ ও জাতির জন্য বড়কিছু করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের সোনার হরিণের চাকরি ছেড়ে দেন। ইঞ্জিনিয়ার ইজাবউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে রাজশাহী ও কুষ্টিয়া সুগার মিল নির্মাণ কাজের সুযোগ পান। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি সুগার মিলের মত বৃহৎ শিল্প কারখানা নির্মাণ কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। এধরনের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ অবাঙালিদের জন্য এককভাবে নির্ধারিত ছিল। ব্যবসা বাণিজ্য চাকরি এবং শিল্পকারখানায় বাঙালিদেরকে কোণঠাসা করে রেখেছিল তারা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা সবকিছুতেই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এরকম এক বিরূপ পরিবেশে ১৯৬৪ সালে ‘ন্যাশনাল জুট মিল’ নামে একটি বৃহৎ জুট মিল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ইঞ্জিনিয়ার ইজাবউদ্দিন আহমেদ। দু’শ বিঘার উপর প্রতিষ্ঠিত জুট মিলটি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝিতে চালু হয়। প্রথম বছরেই মিলটি লাভ করে।

 

 

মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ

 

বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ। ঠাকুরগাঁও উপজেলার সৈয়দপুর দানারহাট নামক গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম আবর আলী মুন্সী। মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ সে সময়ে শিক্ষায় অনগ্রসর ঠাকুরগাঁওয়ে ইসলামী শিক্ষা বিকাশে ও ইসলামী মূল্যবোধে সাধারণ মানুষকে জাগ্রত করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ পারিবারিক ঐতিহ্যেই ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হন। কোরআন, হাদীস এবং ইসলামী শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি কলকাতা হুগলী মাদ্রাসা থেকে ১৯১৭ সালে জামাতে উলা পাশ করেন। এর পূর্বেই তিনি এন্ট্রান্স পাসও করেন। ছাত্রাবস্থায় হাফিজ উদ্দীন আহমদ মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁরই ভাবশিষ্য হিসেবে কংগ্রেসে যোগদান করেন। তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৩  সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুর হক ও মাওলানা আকরাম খাঁ-র নেতৃত্বে হাফিজ উদ্দীন আহমদ মুসলিম লীগে যোগ দেন। তিনি দিনাজপুর জেলা থেকে মুসলিম লীগের প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হন। একই সাথে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বঙ্গীয় কৃষক প্রজা সমিতির ঠাকুরগাঁও মহকুমার সভাপতি ছিলেন। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঋণ সালিশি বোর্ডেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। জনকল্যাণ ও পল্লী উন্নয়নমূলক কাজের জন্য পুরস্কৃত হন। ইউনিয়ন বোর্ডের আদর্শ প্রেসিডেন্ট ও ঋণ সালিশি বোর্ডের আদর্শ চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তিনি বেগুনবাড়ি মাদ্রাসা ও দানারহাট মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ঠাকুরগাঁও সালন্দর আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দানারহাট ও বেগুনবাড়িতে পোস্ট অফিস স্থাপন করেন। দানার হাট দাতব্য চিকিৎসালয় ও ভেলাজান দাতব্য চিকিৎসালয় তাঁর দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত। এগুলো বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে জাতীয়করণ হয়েছে। পেশাগত জীবনে মাওলানা হাফিজ উদ্দীন আহমদ শিক্ষক ছিলেন। পীরগঞ্জ হাইস্কুলে প্রথম চাকরি করেছেন। ১৯২৩ সালে বেগুনবাড়ি জুনিয়র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান তথা হেড মৌলভি হিসেবে এই মাদ্রাসায় যোগদান করেন এবং সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। এই কর্মীপুরুষ ৯৬ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালে ইন্তেকাল করেন।